মুক্তমত

ধর্ষণ প্রতিরোধ প্রসঙ্গে কিছু কথা

বিশ্বে প্রতিটি পদক্ষেপেই নারীর ভূমিকা অনস্বীকার্য। বর্তমানে উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে নারীরা অধিষ্ঠিত হচ্ছেন স্ব-স্ব অবস্থানে। তবু নারীরা নিরাপদ নয়। এ বিষয়টি খুবই দুঃখজনক যে, স্বাধীনতার ৪৯ বছরেও এদেশে নারীরা ধর্ষিত হচ্ছে। সচেতন জনগণ বিচারের দাবি নিয়ে আন্দোলন করছে এবং কোনো কোনো ধর্ষক বিচারের আওতায়ও আসছে। ইতোপূর্বে একাধিক ধর্ষণের কোনো শাস্তিই হয়নি। আমরা জানতেও পারিনি। বিচ্ছিন্নভাবে দু-একটি ঘটনা মিডিয়ায় এলে আমরা কিছু সময়ের জন্য প্রতিবাদ করি। তারপর যার যার কাজে ব্যস্ত হয়ে যাই। ফলে ধর্ষণ সমাজে একটি ভয়ংকর ব্যাধিতে পরিণত হয়েছে। এ অবস্থায় ধর্ষণপ্রবণতা বৃদ্ধি হওয়ার মূল কারণগুলো আমাদের প্রথমে খতিয়ে দেখতে হবে।

মূলত রাষ্ট্রীয় অবকাঠামো, আইনি ব্যবস্থার জটিলতা, ধর্মীয় ও সামাজিক মূল্যবোধের অভাব, আকাশ সংস্কৃতির অবাধ প্রচার ও প্রসার, সুস্থ সাহিত্য ও সংস্কৃতি চর্চার সুযোগ না থাকা ইত্যাদিকে এক্ষেত্রে চিহ্নিত করা চলে। আমরা যদি গত বছরের জরিপের দিকে তাকাই তাহলে দেখতে পাব, ২০১৯ সালের জানুয়ারি-ডিসেম্বর পর্যন্ত ১ হাজর ৭০৩ জন নারী ও শিশু ধর্ষণের শিকার হয়। এর মধ্যে গণধর্ষণের শিকার ২৩৭ জন। ধর্ষণের পর হত্যা করা হয় ৭৭ জনকে। ধর্ষণের ঘটনায় আত্মহত্যা করে ১৯ জন। বছরটিতে ২৪৫ জনকে ধর্ষণের চেষ্টা করা হয়েছে। আর বছরটিতে ধর্ষণসহ বিভিন্ন ধরনের নির্যাতনের শিকার হয় ৪ হাজার ৬২২ জন নারী ও শিশু। জরিপটিতে আরো বলা হয়েছে, গত বছর শ্লীলতাহানির শিকার হয় ৯১ জন। যৌন নির্যাতনের শিকার ১৮৫ জন।

এখন ধর্ষণ বন্ধ করতে হলে পারিবারিক, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয়ভাবে দায়িত্বশীলতা বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে কঠোর আইন প্রয়োগ করে ধর্ষকদের উপযুক্ত শাস্তি দিতে হবে। পারিবারিকভাবে সন্তানের ওপর খেয়াল রাখতে হবে, সে কোনো অস্বাভাবিক জীবনযাপন করছে কি-না, কেমন বন্ধু-বান্ধবের সঙ্গে চলাফেরা করছে। অশ্লীল পত্রপত্রিকা ও বইয়ের ব্যবসা বন্ধ করতে হবে। ধর্মীয় অনুশাসন মেনে চলতে হবে। এক্ষেত্রে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকেও অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে হবে। সাদাকে সাদা আর কালোকে কালো বলে বিবেচনা করতে পারার ক্ষমতা শিক্ষার্থীদের মনে সঞ্চারিত করতে হবে। ছোটবেলা থেকেই যদি সাহিত্য ও সংস্কৃতি নিয়ে কারো মনে উৎসাহের রেখাপাত করা যায়, তাহলে অন্যায় থেকে অনেক দূূরে থাকার মন-মানসিকতা তৈরি করা সম্ভব। আইনের গতিশীল, সঠিক ও সুষ্ঠু প্রয়োগ থাকতে হবে। অপরাধী শাস্তি পায় না বলে আরো অপরাধ করার স্পর্ধা ও সুযোগ পেয়ে যায়। তাকে দেখে অন্যরাও অপরাধ করতে উৎসাহ বোধ করে। আর এ কারণেই সমাজ, জাতি ও রাষ্ট্র কলুষিত হচ্ছে। তার ফলস্বরূপ আমরা দেখি যে, বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো সর্বোচ্চ শিক্ষাঙ্গনে ধর্ষণের সেঞ্চুরি হয়। তারপরও ধর্ষক বুক ফুলিয়ে রাস্তাঘাটে হাঁটে। অধিকাংশ ধর্ষক ক্ষমতাসীন দলকে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে অপব্যবহার করছে। একে রোধ করতে হবে। সর্বোপরি অপরাধ যে-ই করুক, এ ধরনের বিকৃত মানসিকতা তথা এমনসব অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির বিধান করতে হবে। আমাদের বিবেককে জাগ্রত করতে হবে। তার জন্য প্রয়োজন সচেতনতা সৃষ্টি। এ বিষয়গুলোতে নজর দিলে ভবিষ্যতে ধর্ষণপ্রবণতা রোধ করা যাবে বলে মনে করি।

জেনেভা কনভেনশনে ধর্ষণকে যুদ্ধাপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। যুদ্ধের ময়দানে অনেকেই ধর্ষণকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করেছে জাতিগত দমনের উদ্দেশ্যে এবং সেই ব্যবহার এখনো চলছে। যুদ্ধের ময়দানে ধর্ষণকে অন্যান্য মারণাস্ত্রের মতো একটি অস্ত্র হিসেবে ব্যবহারের ইতিহাস বেশ পুরনো। একাত্তরে আমাদের স্বাধীনতাযুদ্ধে অন্তত দুই লাখ নারী ধর্ষণের শিকার হয়েছেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় প্রায় ২০ লাখ নারী ধর্ষণের শিকার হয়। রুয়ান্ডায় এই সংখ্যা প্রায় পাঁচ লাখ, কঙ্গোতে সাড়ে চার লাখ। বিশ্বে বিভিন্ন অঞ্চলে যুদ্ধ ও সংঘাত চলাকালে এই পরিসংখ্যান প্রায় একই রকম। কিন্তু  স্বাধীনতার সুবাদে আমাদের দেশে যুদ্ধভিত্তিক ধর্ষণ থামলেও আমাদের জাতীয় জীবনে ধর্ষণ থামেনি। মানবাধিকার বিষয়ক একটি সংস্থার দেওয়া তথ্যমতে, ২০০১ সাল থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত এদেশে ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে ১৩ হাজার ৬৩৮টি, যার মধ্যে গণধর্ষণ ছিল ২ হাজার ৫২৯টি। ধর্ষকদের বিষাক্ত দৃষ্টি থেকে বাদ যায়নি শিশু, প্রতিবন্ধী থেকে ষাটোর্ধ্ব মহিলা কেউই। এ সময়ের মধ্যে ৬ হাজার ৯২৭ শিশুকে ধর্ষণ করা হয়। ধর্ষণের পরে হত্যা করা হয় ১ হাজার ৪৬৭ জনকে। ধর্ষণের গ্লানি সইতে না পেরে আত্মহত্যা করেন ১৫৪ জন। পরিসংখ্যানগুলো সত্যিই অনেক ভয়াবহ।

ধর্ষণের এই পরিসংখ্যানের আড়ালে লুকিয়ে আছে আরেকটি চিত্র, সেটি হচ্ছে পরিসংখ্যানে ধর্ষণের যে তথ্য-উপাত্ত দেওয়া হয়, সেটি কেবল পুলিশের কাছে দায়ের করা অভিযোগ অথবা গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদের ওপর ভিত্তি করে তৈরি। এই সংখ্যার বাইরেও আছে বিশাল আরেকটি সংখ্যা, যেখানে নারীরা লোকলজ্জার ভয়ে ধর্ষণ বা যৌন নির্যাতনের কথা প্রকাশ করে না। বাংলাদেশের মতো রক্ষণশীল দেশগুলোতে এই প্রেক্ষাপট কতখানি ভয়াবহ হতে পারে, সেটি সহজেই অনুমেয়। ধর্ষিতারা লোকলজ্জার ভয়ে নির্যাতনকে গোপন করছেন, ধর্ষকরাও পার পেয়ে যায় নানা ফন্দি-ফিকিরে। এই সংস্কৃতিই হয়তো ধর্ষকামীদের ধর্ষণ করার সাহস জোগায়। ফলে উচ্চশিক্ষিত বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকও যৌন হয়রানি করে, ধর্মীয় লেবাসধারী কিছু অসাধু ধর্মের জ্ঞান নিয়েও ধর্ষণে অংশ নেয়, নিম্নবিত্ত বাসের ড্রাইভার-হেলপারও ধর্ষকামী হয়ে ওঠে।

এখন ধর্ষণ করলে পার পাওয়ার কোনো সুযোগ নেই, এমন একটি সামাজিক ও প্রশাসনিক সংস্কৃতি তৈরি করতে হবে, যেখানে কঠোর পরিণতির ভয়ে মন আর ধর্ষকামী হয়ে উঠবে না। এই পরিস্থিতিতে আমাদের ভাবতে হবে, আমরা হাঁটছি একটি ঘুণেধরা সমাজের দিকে, যেখানে নারীদের নিরাপত্তা কমে আসছে দিন দিন। ধর্ষকের মৃত্যুদণ্ডের দাবির আগে এই দাবি করব আর যেন ধর্ষিত না হতে হয় কোনো নারীকে।

বাংলাদেশ হোক একটি মেধাবান্ধব সমাজ। মেধাবান্ধব সমাজ গঠনে কোনো গবেষণা নেই। এখানে চলে জেন্ডার রাজনীতিসহ আরো অনেক রাজনীতি। এখানে নারীবাদী হতে পারলে সুবিধা পাওয়া যায়। তাই সবাই নারীবাদী হতে চাচ্ছে। দেশের বেশিরভাগ অ্যাপার্টমেন্টে যৌন নির্যাতন হচ্ছে। কারণ বাবা-মায়েরা কতটুকু খেয়াল রাখবে। আমাদের দেশে এখন যে অবস্থা চলছে, চকোলেট খাইয়ে, মোবাইলের গেম দিয়ে যৌন নির্যাতন করা হয়। সব যৌন নির্যাতনই ধর্ষণ কিন্তু আমরা ধর্ষণ বলতে পাবলিক প্লেসে যেটা হয় সেটাকে নিয়ে মাথা ঘামাই। যেটা সব ধর্ষণের মাত্র ৫ ভাগ। বাকি ৯৫ ভাগ পরিবারকেন্দ্রিক এবং কর্মস্থল।

স্বাধীনতার ৪৯ বছরে বিভিন্ন সময়ে ইয়াসমিন, বুশরা, শম্পা, তন্নী, মিতু, খাদিজা, নুসরাতসহ ধর্ষণ ও হত্যার শিকার হয়ে তাদের আত্মাকে হাহাকার করতে শুনেছি। যাদের বেদনায় কলংকিত বাংলাদেশের সার্বভৌম মানচিত্র। এই লেখা পর্যন্ত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী ধর্ষণের নির্মম ঘটনায় ১৭ কোটি জনগণ আজ মর্মাহত। সেই সঙ্গে শাক দিয়ে মাছ ঢাকার মতো করেই ধরা হলো সিরিয়াল কিলার ক্ষীণকায় মজনুকে। মনে রাখতে হবে আমরা ৩০ লাখ শহীদের ত্যাগী মনোভাবী সন্তান। আর তাই একদিন উচ্চকণ্ঠে অন্যায়ের প্রতিবাদে এগিয়ে আসবে এদেশের সাহসী সন্তানরা মশাল মিছিল হাতে। বিদ্রোহী কবির কণ্ঠে কণ্ঠ মিলিয়ে বলবে সবাই— ‘বিশ্বে যা-কিছু এলো পাপ-তাপ বেদনা অশ্রুবারি,/অর্ধেক তার আনিয়াছে নর, অর্ধেক তার নারী।’

লেখক : শান্তা ফারজানা

প্রতিষ্ঠাতা ও পরিচালক, সাউন্ডবাংলা স্কুল  

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button
Close
Close