প্রবাস

মাহফুজার এক হাসিতেই সব শেষ!

একদিন কলেজ থেকে বাসায় ফেরার পথে চার পাঁচজন ছেলে আমাকে ঘিরে ধরে। একজন জামার কলার চেপে চোখ দুটি বড় বড় করে বলল, কিরে তুই মোতালেব মিয়ার বাড়িতে কি করিস?

আমি জবাব দেওয়ার আগেই আরেকজন বলল, তুই জানিস আমাদের বড় ভাই মাহফুজাকে ভালোবাসে।

আমি হতবিম্ব হয়ে তাদের দিকে তাকিয়ে আছি। কি বলব বুঝতে পারছি না। আচমকা যখন কেউ আক্রমণ করে তখন মস্তিষ্ক কাজ করা বন্ধ করে দেয়। কি বলা উচিত বা কি করা উচিত মস্তিষ্ক তা ঠাহর করতে পারে না।

তবে আমি যা বোঝার বুঝে গেছি। ওদের একজন মাহফুজাকে ভালোবাসে। হয়ত কেউ দেখেছে মাহফুজা ছাদ থেকে আমার সাথে ঈশারায় কথা বলছে কিংবা আমাদের দু’জনের চালচালন ওদের কাছে সন্দেহজনক মনে হয়েছে।

পেছন থেকে একজন কালো সানগ্লাস পরিহিত গুন্ডা টাইপের ছেলে ওদের সরিয়ে দিয়ে আমার সামনে এসে দাঁড়াল। গুন্ডা টাইপের বলছি এই কারণে আমাদের দেশে গুন্ডা টাইপ বলতে বুঝায় মাথার চুল বড় বড়। গলায় মোটা কয়েকটা চেন। হাতের প্রতিটি আঙুলে আংটি। জামার বুকের বোতাম খোলা। মুখে সিগারেট।

সে সিগারেটে টান দিয়ে মুখভর্তি ধোঁয়া ছেড়ে বলল, এই তুই মাহফুজাদের বাড়িতে কি করিস? আর শুনলাম তুই নাকি মাহফুজার লগে টাংকি মারিস। তোকে দুই দিন সময় দিলাম এর মধ্যে বাড়ি ছেড়ে পালাবি নইলে তোর খবর আছে। আমি আমতা আমতা করে বললাম, ভাই আপনি কি বলছেন বুঝতে পারছি না। এবার সে ঠাস করে গালে চড় বসিয়ে বলল, হারামি মাহফুজার সাথে পিরিত করছ আবার বলিস আমার কথা বুঝিস না।

আমি প্রতিবাদ করে তাদের ভুল ভাঙ্গাতে যাব কিন্তু তার আগেই তারা সবাই মিলে আমাকে মারধর শুরু করে।

বাসায় ফেরার পর আমার অবস্থা দেখে তারা সবাই বুঝে যায় আমার উপর বিশাল ঝড় বয়ে গেছে। আমার সাথে কি ঘটেছে তা জানার জন্য তারা উদগ্রীব হয়ে বসে আছে। কিছু ছেলে রাস্তায় দাঁড় করিয়ে আমাকে মারধর করেছে এই কথা তাদের কি করে বলি। আমাদের দেশে কারো হাতে মাইর খেয়ে আসা লজ্জার তবে কাউকে মেরে আসাটা আনন্দ ও গৌরবের।

তাদের পিড়াপিড়িতে বাধ্য হলাম প্রকৃত ঘটনা খুলে বলতে। সব শুনে তাদের বুঝতে বাকি রইল না কে আমার সাথে এমন আচরণ করেছে। কিছুদিন আগেও নাকি বখাটে ছেলেটি মাহফুজাকে বিরক্ত করত। তারা তাকে সাবধান করে দিলে আর বিরক্ত করেনি। এখন নতুন করে বিরক্ত করতে শুরু করেছে। বাড়িওয়ালা আমাকে বললেন, তুমি কোথাও যাবে না। ওই বদমাইশকে আমি এলাকা ছাড়া করব।

তারা আরও নানা কথা বলছে কিন্তু আমি তাদের কথা মনোযোগ দিয়ে শুনছি না। আমি এদিক ওদিক তাকিয়ে মাহফুজাকে খুঁজছি। তার দেখা পেলে বলতাম দেখো তোমার জন্য আমি এমন হাজারো আঘাত সহ্য করতে পারব। কিন্তু কোথাও তার উপস্থিতি টের পেলাম না।

তবে ছেলেরা মারধর করলেও আমার মনে মাহফুজার জন্য প্রেম জেগে উঠেছে। এতদিন তাকে শুধু দেখতাম। এখন তার সাথে কথা বলতে মনটা ব্যাকুল হয়ে উঠল। তাকে যে করেই বলতে হবে আমি তাকে ভালোবাসি। প্রেমে নাকি প্রতিযোগিতা থাকা চাই। যেখানে প্রতিযোগী নাই সেখানে নাকি প্রেমটা জমে উঠে না। এখন আমার প্রতিযোগী গুন্ডা টাইপের ছেলেটা। তার মাইরের প্রতিশোধ নিতে হলে মাহফুজাকে ভালোবাসতে হবে।

বাড়িওয়ালা কাকা, কাকী সবাই আমার চারপাশ ঘিরে বসে আছে। আজ মাইর খাওয়ার পর বুঝতে পারছি এদের সাথে আমার রক্তের সম্পর্ক না থাকলে কখন যে আমাদের মাঝে ভালোবাসার সেতু রচিত হয়েছে তা কেউ টের পাইনি।

মানু্ষ বড়ই বিচিত্র স্বভাবের, একজন আরেকজনকে কখন যে প্রাণের চেয়ে ভালোবেসে ফেলে তা বোঝা বড়ই কঠিন। আবার সামান্য কারণে সেই ভালোবাসার মানুষটাকে হত্যা করতেও দ্বিধাবোধ করে না।

আমি মাহফুজার সাথে কথা বলার জন্য সুযোগ খুঁজতে থাকি। বিকেলে বাড়িটা ফাঁকা থাকে। বাড়িওয়ালা কাকা মসজিদে যায়, তার দুই ছেলে মাঠে খেলতে যায়। চাচী রান্না নিয়ে ব্যস্ত থাকে। এই সময়টা মাহফুজা ছাদে থাকে। ভাবছি মাহফুজার সাথে কথা বলার জন্য ছাদে যাব।

এমন সময় তাদের গৃহকর্মী এসে বলল, আপনাকে আপা ছাদে যেতে বলেছে। মাহফুজা আমাকে যেতে বলছে, একথাটি আমার বিশ্বাস হচ্ছে না। মনে হচ্ছে আমি দিবাস্বপ্ন দেখছি। আমার হার্টবিট বেড়ে গেল।

আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে প্রস্তুত করে ধীরে ধীরে ছাদে গেলাম। মাহফুজা অন্যদিকে মুখ ঘুরিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। তার পরনে আজ হলুদ রঙ্গের সালোয়ার কামিজ। মাথার চুলগুলো মৃদ বাতাদে উড়ছে। আমার উপস্থিতি টের পেয়ে সে ঘুরে দাঁড়াল। এই প্রথম তাকে কাছ থেকে দেখছি। আহা যেন কোন ছায়ামূর্তি আমার কল্পনার কোনো নারী। যার ছবি আমি কল্পনায় এঁকেছি। তার চোখের কাজল, ঠোঁটে মৃদু হাসি আমাকে স্বর্গীয় অনুভূতি এনে দিলো।

আমি তোতলাতে তোতলাতে বললাম, আমি তোতলা বলে আপনি সেদিন হেসেছিলেন তাই আমার খুব রাগ হয়েছিল। কিন্তু আপনাকে দেখার পর আমার সব রাগ উবে গেছে। এমন সুন্দরী মায়াবী নারীর সাথে রাগ করে থাকা যায় না। সে চাপা হাসি দিয়ে হাত দিয়ে মুখ চেপে বলল, সেদিনের জন্য আমি দু:খিত। তবে আপনাকে আমার খুব ভালোলাগে।

এরপর দু’জন চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছি। কি বলব বুঝে উঠতে পারছি না। যখন নর-নারী প্রথম সাক্ষাতে মুখোমুখি হয় তখন তাদের মস্তিষ্কে শব্দ ভান্ডার শূন্য হয়ে যায়। সেখান থেকে কৌশলে শব্দ সংগ্রহ মনের ভাব প্রকাশ করতে হয় কিন্তু সবাই তা পারে না। মাহফুজা বলল, আচ্ছা আপনাকে গুন্ডা পোলাগুলো মারল কেন?

আমি নাকি আপনাকে ভালোবাসি। আমার সাথে নাকি আপনার প্রেমের সম্পর্ক। তাই তারা আমাকে আল্টিমেটাম দিয়েছে আগামী দুইদিনের মধ্যে বাড়ি ছেড়ে যেতে।

তাদের এত বড় সাহস আচ্ছা আব্বা তাদের মজা দেখাবে। আর শুনন আমি চাই আপনি এই বাড়িতে থাকেন। ভীতু কাপুরুষের মতো পালিয়ে যাবেন না।

আমাদের মাঝে তো কোনো প্রেমের সম্পর্ক নেই। তাই চলে যেতেও আমার আপত্তি নেই।

না আপনি যাবেন না।

এরপর সে দ্রুত নিচে চলে যায়। আমি তার সাথে কথা বলে মুগ্ধ হই। মনে হয় এই জীবনে তাকে আমার প্রয়োজন। কিন্তু সে কি আমাকে ভালোবাসবে?

সূত্রঃ নিউজ ডেস্ক

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Close
Close