দেশজুড়ে

বাংলাদেশের স্বর্ণসূত্র পাট,হারিয়েছে তার প্রাচীন ঐতিহ্য

মেহেরুল ইসলাম নাটোর প্রতিনিধি: বাংলাদেশ কৃষি প্রধান দেশ,পাট বাংলাদেশের  প্রধান অর্থকরী ফসল।যাহা বিদেশে রপ্তানি করে বাংলাদেশ প্রচুর অর্থ আয় করে।এজন্য-ই পাটকে সোনালী আঁশ বলা হয় এবং পাট-ই বাংলাদেশের শতবর্ষের ঐতিহ্য বাহন করে আসছে যুগ যুগ ধরে।ভারত,পাকিস্তান,ইন্দোনেশিয়া,ভিয়েতনাম,মায়ানমার সহ বিভিন্ন দেশে পাট উৎপাদন হলেও পৃথিবীর ৪(চার)ভাগের ৩(তিন)ভাগ-ই পাট বাংলাদেশে জন্মে।যার ফলে বহির্বিশ্বে ও বাংলাদেশের উৎপাদিত পাট দিয়ে তৈরি পণ্যের ব্যাপক চাহিদা থাকলেও বর্তমানে পাটের সেই প্রাচীন ঐতিহ্য প্রায় অস্তমিত।যুগের পরিবর্তনে পাটের দড়ি,বস্তা,চট,থলে/ব্যাগ, এবং পাটের শাড়ির স্হান দখল করে নিয়েছে বর্তমানে প্লাস্টিকের উৎপাদিত পন্য সামগ্রী।যার কারনেই বাংলাদেশের স্বর্ণ সূত্র সোনালী আঁশ হারিয়েছে তার প্রাচীন ঐতিহ্য।

অপর দিকে বছরের পর বছর দেশের পাটকলগুলোকে লোকসান গুনার কারণে পাটকলগুলো সংস্কার ও আধুনিকায়নের জন্য পাটকলের উৎপাদন কার্যক্রম বন্ধ ঘোষণা হয়। ফলে গত বছরের তুলনায় এবার পাটের চাহিদা কমে যাওয়ার আশঙ্কায় আছেন পাট চাষীরা। আর পাটের চাহিদা কমে গেলে পাটের দামও কমে যাওয়ার শঙ্কা রয়েছে। যা বাস্তবে রূপ নিলে লোকসানের মুখে পড়বে এসব চাষীরা।
তেমনি সারাদেশের ন্যায় আসছে মৌসুমে পাটের ন্যায দাম নিয়ে শঙ্কায় রয়েছে নাটোরের লালপুর উপজেলার পাট চাষীরাও।
তেমনি একজন লালপুর উপজেলার দুড়দুড়ীয়া ইউনিয়নের গন্ডবিল গ্রামের পাটচাষী আলতাব হোসেন গত কয়েক বছর ধরে অন্য ফসলের তুলনায় পাটের দাম ও চাহিদা ভালো থাকায় দুই বিঘা জমিতে পাট চাষ করেছিলেন তিনি।ফলনও হয়েছে  ভালো। তবে এবার রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকলের উৎপাদন কার্যক্রম বন্ধ ঘোষণা করায় ভালো দাম না পাওয়ার  আশঙ্কায় আছেন তিনি।
কৃষি সরঞ্জামসহ কীটনাশক, ভিটামিন ও জৈব সারের দাম বেশি হওয়ায় পাট উৎপাদন খরচ বেশি।তার ওপর বৈশ্বিক মহামারি প্রাণঘাতী  করোনা ভাইরাসের কারণে পাটের দাম কেমন হবে তা নিয়ে দুশ্চিন্তা রয়েছেন মনিহারপুর  এলাকার আরেক কৃষক আশরাফ আলী।
এছাড়া একাধিক পাটচাষী জানান, মাথার ঘাম পায়ে ফেলে তারা ক্ষেতে ফসল ফলান। বন্যা, খরা, অনাবৃষ্টি ও অতিবৃষ্টির মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ তো আছেই, সাথে কীটনাশক, সার ও শ্রমিকের মজুরিসহ ইত্যাদির চড়া মূল্য। তবে এতসব সংকট মোকাবিলা করে ফসল ফলিয়েও কৃষকেরা যদি ফসল বিক্রি করে ভালো দাম না পায় তবে পাট চাষে আগ্রহ হারাবে বলে জানান তারা।
এ বিষয়ে প্রবীন সাংবাদিক আব্দুর রশিদ মাষ্টার বলেন, কৃষি প্রধান বাংলাদেশের প্রধান অর্থকরী ফসল ছিল পাট । তাই পাটকে স্বর্ণ সূত্র বলা হত। পাট বা পাটজাত দ্রব্যের একসময় বিশ্ব বাজারে ব্যাপক চাহিদা ছিল। পাট দিয়ে তৈরি পণ্যের ব্যাপক চাহিদা থাকার করনে পাটকে বাংলাদেশের স্বর্ণসূত্র বলা হতো যার কারনে পাটের সোনালী আঁশ দিয়ে তৈরি বস্তা,চট,দড়ি,ব্যাগ,বাহারি পাপোশ/পা দানি সহ রংপাটের-বেরঙের শাড়ি উৎপাদন করে বিদেশে রপ্তানি করে সিংহভাগ বৈদেশিক স্বর্ণমুদ্রা অর্জণ করা হতো।কালের বির্বতনে প্লাস্টিকের উৎপাদিত পন্যর ব্যাপক ব্যাবহারের ফলে পাটজাত পণ্যের চাহিদাহারিয়ে ফেলেছে। প্লাস্টিকের ব্যবহার করার কারণে মাটির উর্বরতা শক্তি নষ্ট হচ্ছে। বিশ্ববাজারে পাটের চাহিদা কমে যাওয়ায় তথা পাটের দাম কমে যাওয়ায় পাট চাষীরা পাট চাষে নিরুৎসাহিত হচ্ছে এবং স্থানবিশেষে পাস নাই বললেই চলে। তাই পাটজাত দ্রব্য ব্যবহারে আমরা সকলেই যদি উৎসাহিত হই এবং ব্যবহার বাড়াই তাই বাংলাদেশের স্বর্ণ সূত্রপাঠ ফিরে পাবে তার হারানো গৌরব সেইসাথে পাট পাতা পচা মাটি হয়ে উঠবে উর্বর। আর প্লাস্টিকের ক্ষতিকর দ্রব্য মাটির উর্বরতা নষ্ট করবেনা আমরা ফিরে পাব প্রাকৃতিক ভারসাম্য তা। আর বাংলাদেশের সোনালী আঁশ ফিরে পাবে তার প্রাচীন গৌরব ঐতিহ্য।
অপর দিকে লেঃ কর্ণেল রমজান আলী সরকার (অবঃ) বলেন,বাংলাদেশে উৎপাদিত সোনালী আঁশ(পাট)এর প্রায় ৫১% পাটকলে ব্যাবহৃত হয়,৪৪%কাঁচা পাট বিদেশে রপ্তানি করা হয়,এবং বাকী ৫%পাট গৃহস্থালি ও কুটির শিল্পে ব্যাবহৃত হয়ে থাকে।
কিন্তু বাংলাদেশে পাটকলগুলো লোকসানের কারনে বন্ধ থাকায় এ বছর পাটের দাম কমে যাওয়ার শঙ্কা রয়েছে।যা প্রতিফলিত হলে পাট চাষীদের লোকসানের আশঙ্কা থেকে যায়।তাছাড়া পাটের পাতা জমিতে উর্বরতা বৃদ্ধি করে ফলে দেশে পাট উৎপাদন কমে গেলে প্লাস্টিক বা পলিথিনের চাহিদা বেড়ে যাবে।যার বিরূপ প্রভাবে পরিবেশ নষ্ট হবে বলে মনে করেন তিনি।
লালপুর উপজেলার উপ-সহকারী পাট উন্নয়ন কর্মকর্তা দূর্জয় হোসেন জানান, উপজেলায় এবছর ১১,৬১০ একর জমিতে পাট চাষ হয়েছে এবং উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ১০,১০০.৭০। যা গত বছরের থেকে বেশি জমিতে পাট চাষ হয়েছে। কৃষকরা যখন যে ফসলে লাভ বেশি পায় তখন তারা সে ফসলের উপর ঝুঁকে পড়ে। তাই আগামীতে কি পরিমাণ পাট চাষ হবে তা নির্ভর করবে পাটের দামের ওপর।
অর্থকরী ফসল হিসেবে পাট চাষের প্রতি বেশি বেশি নজর দিতে হবে।পাট চাষে কৃষকদের উৎসাহিত করতে হবে,প্রয়োজনে সহজলভ্য কৃষি ঋণের ব্যাবস্তা করতে হবে। উন্নত মানের বীজ সরবরাহ করে পাটের উৎপাদন বাড়ানো সহ সরকার গত বছরের থেকে এবছর আরো বেশি পাট রপ্তানি করতে পারলে দেশের পাটকলগুলোতে বন্ধের প্রভাব পড়বে না বলে জানান স্থানীয় পাট চাষীরা।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button
Close
Close